দুই চাকার রথ

Told Through the Eyes of Two Bangladeshi Women- A 10-Day Bicycle Journey from Tetulia to Teknaf Across Bangladesh

পূর্বকথা

সাইকেলে করে ক্রস-কান্ট্রি রাইড (দেশের কোন এক প্রান্ত থেকে অন্য এক প্রান্ত পর্যন্ত) দেয়ার প্ল্যানটা হুট করে আমার মাথায় কেন আসল সেটা একটা রহস্য। ট্রিপ মানেই আমার জন্য গন্তব্য একটাই- পাহাড় তথা বান্দরবান। সুতরাং সাইকেলে করে দিনের পর দিন হাইওয়ে দিয়ে ঘুরার আইডিয়াটা আমার জন্য একটু ব্যতিক্রম। তবুও মাথায় যখন আসল, বেশি সময় ব্যয় না করে নক দিয়ে বসলাম শাজকে। শাজ একজন দক্ষ রোড বাইকার, টিম বিডিসির (TeamBDC) কোর মেম্বার। ও তো সাথেই সাথেই এক পায়ে (নাকি দুই চাকায়!) খাড়া! প্রথমেই দুইজন রুট নিয়ে আলোচনা করতে বসলাম। বাংলাদেশে ক্রস-কান্ট্রির জন্য প্রচলিত মোটামুটি ৮টি রুট আছে। এই রুটগুলোর ডিস্ট্যান্স প্রায় ৪০০ কিমি (আখাউড়া-মুজিবনগর) থেকে শুরু করে ১০০০ কিমি (টেকনাফ-তেঁতুলিয়া) পর্যন্ত হতে পারে। খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা না করে আমরা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া বেছে নিলাম। মাঝখানে আমি দ্বিধায় ছিলাম যে শুরুতেই এত বড় রুট বেছে নেয়া ঠিক হচ্ছে কিনা, কারণ নিতান্তই শখের বশে সাইক্লিং করা আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিটা খুব বেশি ভারি নয়। আর নিজেকে চিনি বলেই জানি, এত লম্বা সময় বৈচিত্র্যহীন হাইওয়েতে ঘুরতে হলে আমি হয়তো বিরক্তই হয়ে যাব। কিন্তু শাজের এই রুট নিয়ে যেন কোন সন্দেহই নেই, সাইক্লিং করে প্রচুর দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এই মেয়েটার উৎসাহের কাছে হার মেনে অবশেষে নিজের হালকা ঋণাত্মকতাটুকু ঝেড়ে ফেলে দিলাম।

এখন প্ল্যান করার পালা। শুরুতেই শাজ নিয়াজ ভাই এর কাছ থেকে রুট প্ল্যান নিয়ে নিল। প্ল্যানটা প্রচলিত টেকনাফ-তেঁতুলিয়া রুট থেকে বেশ আলাদা (তাই বলে যে কত আলাদা তা কয়েকদিন পরেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি)। ১০ দিনের প্ল্যান, সাইক্লিং করব ৯দিন, টোটাল ১০০০ কিমি এর মত। দুইজন ই গরীব বাইকপ্যাকার। তাই হোটেলের চিন্তা শুরুতেই বাদ। শুরু হল জেলায় জেলায় পরিচিত মানুষ খোঁজার পালা। মূলতঃ শাজ ই তুমুল গতিতে সব ম্যানেজ করে ফেলল, তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো তার ক্যাম্পাসের ক্লাব  Jahangirnagar University Adventure Society তথা JUAS। সব জায়গায় ডাক বাংলো, রেস্ট হাউজ নাহয় ফ্রেন্ডের বাসা, বেশ আলিশান ব্যাপার! আমিও নিশ্চিন্ত মনে টুকিটাকি প্রিপারেশান নিতে শুরু করলাম। আমার সম্বল গরীবের MTB Veloce Outrage, আর শাজের দখলে MTB’র রাজা Ghost!

স্বপ্নের শহর তেঁতুলিয়া

প্ল্যান মাফিক ১০ তারিখ রাত ৯টায় শ্যামলীর শিলিগুড়ির বাস স্ট্যান্ডে হাজির হয়ে গেলাম, গন্তব্য বাংলাবান্ধা। আমাদের ঝামেলা অনেকটা বাঁচিয়ে দিয়ে সাইকেল আস্তই ঢুকে গেল লাগেজ বক্সে, চাকা খোলার দরকার পড়লনা। সাইকেল দুটো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দুইজন বিদায় জানালাম আমাদেরকে সি অফ করতে আসা JUAS এর মেম্বার নিলয়কে।

পরদিন ৮টার মাঝে তেঁতুলিয়া পৌঁছে গেলাম। প্ল্যানে সামান্য চেঞ্জ এনে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত না গিয়ে তেঁতুলিয়া জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর কাছে নেমে যাব বলে ঠিক হল, ফ্রেশ হয়ে তারপর বাংলাবান্ধা ঘুরে আসা যাবে। বাংলোতে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, পাশেই হোটেলে নাস্তা করার সময় আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন শাজের ক্যাম্পাসের সিনিয়র জাকির ভাই, তিনি তেঁতুলিয়ার চা বাগানে বেশ অনেকবছর যাবৎ কর্মরত আছেন। তিনি খুব উৎসাহের সাথে আমাদেরকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব নিলেন। অতঃপর ১০টা নাগাদ দুইজন সাইকেল নিয়ে জাকির ভাইয়ের মোটর বাইকের পিছনে রওনা হলাম। 

স্বপ্নের শহর তেঁতুলিয়া- তেঁতুলিয়ার এই নামকরণ যে একদমই মিথ্যে নয় তা কিছুক্ষণ ঘুরলেই বেশ ভালোভাবে বোঝা যায়। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুবিস্তৃত মহানন্দা নদী বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়াকে আলাদা করে রেখেছে। শহরের একটু দক্ষিণে ছোট বড় বেশ কিছু টিলা আর মাইলের পর মাইল দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান, চা বাগানের কোনো অংশ বাংলাদেশে, কোনো অংশ ইন্ডিয়ায়। অনেক দূরে দূরে অবস্থান করা কিছু সীমান্ত পিলার ছাড়া এই বর্ডার আলাদা করে বোঝার কোন উপায় নেই।

পুরো তেঁতুলিয়ায় একটি ছিমছাম আদর্শ শহরের ছোঁয়া আছে। রাস্তায় তেমন কোন ভারী যানবাহন নেই, রাস্তার পাশে কোথাও ময়লা স্তুপ করা নেই, টি এস্টেটগুলোতে পচনশীল-অপচনশীল-রিসাইক্লেবল দ্রব্যের জন্য আলাদা ময়লার ঝুড়ি আছে, যা আমি বাংলাদেশের আর কোন শহরে দেখিনি। সবচাইতে অবাক করা দৃশ্য চোখে পড়ল একটু পরে, এখানে ছেলে মেয়ে সবার যাতায়াতের সাধারণ মাধ্যম হচ্ছে সাইকেল। মেয়েরা ঝাঁকে ঝাঁকে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, পিছনে ছোট ভাই বা বোনকে সাইকেলে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে বা মহিলারা সাইকেলে করে বাজার করতে যাচ্ছেন। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অতি সভ্য ঢাকার রাস্তায় যা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, এখনো একজন মেয়ে সাইক্লিস্টকে সেখানে হাজারো কৌতূহলী চোখ এবং নোংরা কমেন্টের সম্মুখীন হতে হয়।

তেঁতুলিয়ায় এক ঝাক সাইক্লিস্ট (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)

কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে চা খেতে গেলাম জাকির ভাইয়ের কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেটে। অদ্ভূত স্বাদের পুদিনা পাতার চা শাজের খুব পছন্দ হল। সেখানে জাকির ভাইকে তার আতিথেয়তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে পড়লাম বাংলাবান্ধার উদ্দেশ্যে, এখান থেকে ২০ কিলো।

কিছুক্ষণ মেইন রোড ধরে সাইকেল চালানোর পর বা দিকের একটা রাস্তা পেয়ে ঢুকে গেলাম, উদ্দেশ্য নদীর পাড় ধরে যাব। বেশ কিছুক্ষণ মেঠো পথের এবড়ো থেবড়ো রাস্তা ধরে সাইকেল চালিয়ে পাড়ে পৌঁছে আর লোভ সংবরণ করতে পারলাম না, শাজকে পাহারায় বসিয়ে নেমে গেলাম হিমশীতল মহানন্দায়। অবশ্য পাহারায় বসানোর দরকার ছিলনা, কারণ এই অঞ্চলের আরেকটি অসাধারণ ভালো দিক হচ্ছে এখানকার মানুষ। সারল্যের জন্য বিখ্যাত উত্তরবঙ্গের মানুষের সুখ্যাতির কারণ বোঝা মোটেই কঠিন নয় (সকালেই ডাক বাংলোতে পৌঁছে দেখেছিলাম, বাংলোর মেইন গেট, ভেতরের গেট সবই হাট খোলা)। কিছুক্ষণ পরেই সাইকেল পাহারা তো দূরের জিনিস, শাজ তার সাইকেল বদল করে নিল পাড়েই ঘুরে বেড়ানো একটি পিচ্চির ‘হিরো’ সাইকেলের সাথে। হাইড্রলিক ব্রেকের সাথে পূর্ব পরিচয় বিহীন পিচ্চিটি ব্রেক চেপেই সজোরে একটা আছাড় খেয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগল। দুটি মেয়ে সাইকেল চালিয়ে দেশ ঘুরছে সেটা তাদের জন্য কৌতূহল উদ্দীপক, কিন্তু সেই কৌতূহল অযাচিত যেমন নয়, তেমনি তাদের প্রশ্নগুলো ও সারল্যমাখা। এই চিত্র দক্ষিণে এসেই কিভাবে আমূল বদলে যাবে তা কয়েকদিন পরেই আমরা জানব।

অবশেষে সন্ধ্যার আগে আগে এসে পৌঁছলাম বাংলাবান্ধায়। এসে কিছুটা হতাশই হলাম। এর আগে যখন পাঁচ বছর আগে বাংলাবান্ধায় এসেছিলাম, তখন বর্ডার বলতে শুধুই একটা কাঁটাতারের বেড়া, আশেপাশে জংলা একটা অঞ্চল, সেবার মানুষ তেমন একটা চোখে পড়েনি। এখন ব্যাপার স্যাপার পুরোই আলাদা। বর্ডারে বিশাল গেট করা হয়েছে, আশপাশ ছোট ছোট দোকানে ছেয়ে গেছে, মানুষ গিজগিজ করছে পুরো অঞ্চলে। তার উপর বিজিবির লোকজন সাফ জানিয়ে দিল সাইকেল নিয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঢোকা যাবেনা। অগত্যা হেঁটে গিয়ে জিরো পয়েন্টে দুটো ছবি তুলেই ফিরতি পথে ডাকবাংলোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত, আক্ষরিক অর্থেই পুরো শহরে অন্ধকার নেমে এলো, খুব দূরে দূরে বিএসএফ এর ক্যাম্প থেকে আসা কিছু আলো ছাড়া কোথাও কোন আলো নেই। দূষণবিহীন পরিষ্কার আকাশ ধীরে ধীরে তারায় ভরে উঠল। রাতে পেট ভরে খেয়ে দেয়ে দ্রুতই শুয়ে পড়লাম, সকালে লম্বা পথ যেতে হবে।  

তেঁতুলিয়া থেকে নীলফামারীঃ ১১৫কিলো

আজকে উদ্দেশ্য ১১৫কিলো দূরের নীলফামারি। ভোর ৬.৩০ এর মাঝে নাস্তা করে যখন বের হলাম, তখন ইতিমধ্যে বেশ আলো ফুটে গেছে। আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছি পুরো ট্রিপ জুড়েই যথাসম্ভব হাইওয়ে এড়িয়ে চলব, অর্থাৎ ভিতরের মেঠো পথ বা শর্টকাট রাস্তা যা পাব তাই ধরে ভিতরে ঢুকে যাব। পঞ্চগড় পার হয়ে যখন প্রায় পঞ্চগড়-দেবীগঞ্জ মহাসড়কে ঢুকেছি, তখন সূর্য মাথার উপর। স্বভাবতই আমার ও মন আকুপাকু করতে লাগল নদীতে নেমে একটা ডুব দিয়ে নেয়ার জন্য, কেননা ম্যাপেও দেখতে পাচ্ছি আমাদের সাথে বাম দিকে সমান্তরালে করতোয়া নদী বয়ে যাচ্ছে। একটু বাদেই নদীর খোঁজে ঢুকে গেলাম গ্রামের ভেতরে। শীতকাল সবে বিদায় নিয়েছে, নদীতে পানি খুব বেশি নেই। বেশ আরাম করে যখন একটা গোসল দিয়ে উঠছি, তখন খিদেয় পেট মোচড় দিয়ে উঠেছে, কিন্তু এই অজ পাড়াগায়ে খাওয়ার দোকান কোথায় পাওয়া যাবে সেটাই কথা! এমন সময় আমাদের দেখে খুব আগ্রহ নিয়ে একজন বয়স্ক মহিলা ক্ষেত থেকে কাজ ফেলে এগিয়ে এলেন, একথা সেকথার পর আমাদেরকে খুব কুণ্ঠাভরে তার ঘরে দুটো ডাল ভাত খেয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। আমাদের খুশি আর দেখে কে, সংকোচের মাথা খেয়ে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলাম!

চাচীর একান্নবর্তী পরিবার। সবাই গোল করে আমাদের ঘিরে বসল, তারা আমাদের গল্প শুনতে চায়, শহরের গল্প শুনতে চায়। এই পরিবারটিতেও দেখলাম ছেলে-মেয়ে সবাই সাইকেল চালায়, আমাদের আনন্দমাখা বিষ্ময় দেখে তারাই এর কারণ ব্যাখ্যা করলেন-
উত্তরাওঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারেরই আয় অত্যন্ত সীমিত, তাই যাতায়াতের খরচ বাঁচাতেই তারা সাইকেলকে সম্বল করে নিয়েছে। উপার্জন সবাইকেই করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলেও আমি একই চিত্র দেখেছি, সেখানে নারী-পুরুষ বিভেদ নেই বললেই চলে। পরিবারের অর্ধেক সদস্যকে শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে অকর্মণ্য আর দুর্বল করে রাখার মত বিলাসীতায় তারা বিশ্বাসী না। এধরনের বিলাসীতা যেন শুধু ‘সভ্য’ সমাজেই শোভা পায়। সভ্য সমাজের বাসিন্দারা স্বভাবতই ‘গেঁয়ো’,‘উপজাতি’ দের কাছ থেকে শেখার মত কিছু খুঁজেও পায়না।

তাদের আন্তরিক সমাদরে পেট ভরে খেয়ে দেয়ে যখন রাস্তায় বের হয়েছি, তখন প্রায় তিনটা। এখন উদ্দেশ্য নীলসাগর দিঘী, নীলফামারী থেকে ১৪ কিমি আগে পড়বে। পৌঁছে দেখি এই মার্চের শুরুতেও প্রচুর অতিথি পাখির আনাগোনা। আমাদের বেশ ভূষা দেখে টিকিট কাউন্টারের লোকজন সব বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলেন, সব শুনে বেশ খুশি হয়ে আমাদেরকে টিকিট ছাড়াই ঢুকতে দিলেন। পরিষ্কার বাঁধানো পাড়ে যত্নের ছোঁয়া স্পষ্ট। বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, সূর্য ইতিমধ্যে পাটে বসে গেছে। দুইজন ই অন্ধকারে সাইকেল চালানোর ঘোর বিরোধী। তাই দ্রুত প্যাডেল চালিয়ে বাকি পথটুকু পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম নটখানায়, এখানে সাজের বান্ধবীর বাসা। সেদিনের মত যাত্রার এখানেই সমাপ্তি।

নীলসাগর দিঘী (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)
নীলফামারি থেকে কুড়িগ্রামঃ ১০৭ কিলো

আজকে উদ্দেশ্য রংপুর হয়ে কুড়িগ্রাম পৌঁছানোর। শুনেছি সামনে ‘ভিন্নজগৎ’ নামে খুব সুন্দর একটা এলাকা আছে, তাই তার খোঁজে আমরা একটু ভিতরের দিকে রাস্তায় ঢুকে গেলাম। কিছুদূর যেতে টের পেলাম আমার সাইকেলের সামনের চাকার বিয়ারিং ভেঙে যাওয়ায় বাজে ঘটঘট আওয়াজ হচ্ছে, সাথে সাইকেল চালাতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এত ভোরে কোনো দোকান পাওয়া যাবেনা নিশ্চিত, তার উপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত এসে পড়ল রাস্তার অবস্থা। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে ইচ্ছামত গালি দিয়ে ঝাল মিটাবার চেষ্টা করছি, কিন্তু প্রচন্ড রোদে ততক্ষণে শরীরের অবস্থা একেবারেই অবসন্ন। রংপুর পৌঁছে দেখি সেখানেও শুক্রবার বলে দোকান সব বন্ধ। অগত্যা সাইকেল ঠিক করানোর আশা বাদ দিয়ে ওভাবেই চলতে শুরু করলাম, যদিও পথে দুইজন ই একটা মাঠে নেমে সাইকেলে তেল দিয়ে ভালোভাবে ঘষে মেজে নিয়েছি।

এইদিন পথে চলতে গিয়ে দেখলাম কৌতূহলী জনগণের অসংখ্য প্রশ্নের ভীড়ে ‘তোমরা কোথা থেকে আসছ’ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে, কারণ এই প্রশ্নের উত্তর আসলে হয় তিনটা-

১। ঢাকা

২। তেঁতুলিয়া

৩। আমাদের লাস্ট স্টপেজ (যেমন আজকের জন্য সেটা নীলফামারী)

তিনটার মাঝে কোনটা বলব সেটা নিয়েই দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিলাম প্রতিবার, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বেশ বুঝতে পারলাম চিন্তার কোন কারণ নেই, যেকোনো একটা উত্তর দিলেই প্রশ্নকর্তা নিজেই বাকি দুটোর ও উত্তর বের করেই ছাড়বেন। উদাহরণস্বরূপঃ

-কোথা থেকে আসছ?

-জ্বি ঢাকা।

-সেই ঢাকা থেকে সাইকেল চালিয়ে আসছ?!

-না না, আমরা তেঁতুলিয়া থেকে রওনা হয়েছি, ঢাকা না।

-এক দিনে কি তাহলে তেঁতুলিয়া থেকে এই পর্যন্ত চালিয়ে আসলে?

-জ্বি না, কালকে আমরা নীলফামারী ছিলাম।  

অথবাঃ

-কোথা থেকে আসছ?

-জ্বি নীলফামারী।

-ও, তোমাদের বাসা নীলফামারীতে?

-জ্বি না, আমাদের বাসা ঢাকায়।

-সেই ঢাকা থেকে সাইকেল চালিয়ে আসছ?

-জ্বি না, আমরা তেঁতুলিয়া থেকে রওনা হয়েছি পরশুদিন।

এবং ইত্যাদি।

বিকেল নাগাদ রংপুর পার হয়ে তিস্তা ব্রিজে পৌঁছে গেলাম, পথে রংপুর সাইক্লিস্ট গ্রুপের দুইজনের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ায় তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাদের সাথে বেশ কিছু পথ একসাথে চালিয়ে সঙ্গ দিলো। অতঃপর আঁকা বাঁকা মেঠো পথ পার হয়ে যখন কুড়িগ্রাম ডাকবাংলোতে এসে পৌঁছেছি, তখন সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। পৌঁছে দেখি আরেক বিপদ, বাংলোতে কোন পানি নেই। আমাদের ধূলি ধুসরিত অবস্থা দেখেই হোক বা শাজের ঝাড়ি খেয়েই হোক, বাংলোর কেয়ারটেকার কোথা থেকে দুই বালতি কুচকুচে কালো রঙের পানি দিয়ে গেলেন। অই অবস্থায় আমাদের আর পানির রঙ দেখার সময় নেই, দ্রুত গোসল সেরে নিয়ে খেয়ে দেয়ে পরের দিনের প্ল্যান করতে বসে গেলাম।

কুড়িগ্রাম থেকে শেরপুরঃ ১১২ কিলো

আজ আমাদের চিলমারী নদী বন্দর থেকে নৌকায় নদী পাড়ি দেয়ার কথা, নদী পার হয়ে ওইপারের রাজীবপুর চরে নামতে নামতে আড়াই-তিন ঘন্টা লেগে যাবে, তাই দুইজন ই বেশ আগে ভাগে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। ত্রিশ কিলো পথ পারি দিতে বেশি সময় লাগলনা, কিন্তু চিলমারী বন্দরে পৌঁছে মাথায় হাত, রাজীবপুরের নৌকা ১টার আগে ছাড়বেনা! কিন্তু আমরা চাইলে ২৫কিলো আগে রৌমারী চরে নামতে পারি, রৌমারীর নৌকা কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে যাবে। বুঝলাম এ ছাড়া গতি নেই! দুইজন সাইকেল সহ বিশাল বড় নৌকার ছই এর উপর উঠে বসলাম। সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, এখন বৃষ্টি না থাকলেও আকাশ ধীরে ধীরে কালো মেঘে ঢাকতে শুরু করেছে। বিশাল ব্রহ্মপুত্রের যতদূর চোখ যায় শুধু পানি, আর মাঝখানে হঠাৎ হঠাৎ ছোটো ছোটো দ্বীপের মত চর জেগে উঠেছে। একটু পরে আবিষ্কার করলাম আপনমনেই দুইজন গান গেয়ে যাচ্ছিঃ সুখী হৃদয়ের সুখের গান, শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ।

নৌকার ছই এর উপর আমি ( ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)

বারোটার দিকে রৌমারী আসতে আসতে আকাশ প্রায় কুচকুচে কালো হয়ে এলো। চারিদিকে ধূলার ঝড় বইছে। দ্রুত কিছু মুখে দিয়েই সাইকেলে উঠে পড়লাম। কিন্তু সাইকেল চালাব যে, রাস্তা কোথায়! এ তো শুধু কাদা-পাথর-বালি! তার মধ্যে ধূলিঝড়ে চোখ খোলা রাখাই দায়, যমদূতের মত এক একটা ট্রাক আর বাস এসে ধূলায় সব ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম সাইকেলে তেল দিতেই হবে, নাহলে আর এগুনো যাচ্ছেনা। একটা ভালো জায়গার খোঁজ করতে রাস্তা থেকে সরে এসে বামে তাকিয়েই মন ভালো হয়ে গেল, বেশ নিচে নদী দেখা যাচ্ছে, নদীর পাড় জুড়ে বিশাল খোলা একটা মাঠ, পাড়েই ছাউনির নিচে একটা চৌকি পেতে রাখা, ঠিক যেন আমাদের জন্যই এ আয়োজন। কোনমতে বালি দিয়ে হাচড়ে পাচড়ে সাইকেল নামালাম, কিন্তু দু দন্ড শান্তিতে বসার জো নেই, দুই এলিয়েনের খোঁজ পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাউনির চারপাশে পনের-বিশেক পঙ্গপাল জুটে গেল। ততদিনে আমরা বেশ অভ্যস্ত এধরনের অভ্যর্থনায়। উদাস হয়ে তাদের অজস্র প্রশ্ন এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতে লাগলাম।

এক ঘন্টায় সাইকেল সেরে, গোসল দিয়ে যখন আবার বালির পাহাড় দিয়ে সাইকেল উঠানো শুরু করেছি তখন বেশ বেলা হয়ে এসেছে। বৃষ্টি হবে হবে ভাব, তাই পরিবেশ বেশ গুমোট, কিন্তু ভেজা কাপড়ে গরম গায়ে লাগছেনা। এদিকে রাস্তার অবস্থার ও কোন উন্নতি নেই, বিকেল পর্যন্ত ঘন্টায় ৮-৯কিলো স্পিডে সাইকেল চালিয়ে বুঝলাম কোনভাবেই আজ ৮-৯টার আগে শেরপুর পৌঁছানো সম্ভব হবেনা। তার উপর টানা ৪-৫ ঘন্টা যাবৎ এই রাস্তার সাথে যুদ্ধ করতে করতে এখন হাতের প্রতিটি জয়েন্ট একেকটি ঝাঁকুনির সাথে বিদ্রোহ করে উঠছে, আর প্যাডেড শর্টস তো তারো অনেক আগেই হার মেনে নিয়েছে। মনে মনে নিয়াজ ভাইয়ের রুট প্ল্যানের চৌদ্দগুষ্টী উদ্ধার করতে করতে হঠাৎ বামে তাকিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম, আরে! কাছেই পাহাড় দেখা যাচ্ছে! ম্যাপ খুলে দেখি আসলেই তাই, আমরা ইন্ডিয়ান বর্ডারের একদম কাছে চলে এসেছি, অল্প দূরত্বেই মেঘালয়। দূরে বড় পাহাড়টার নাম দেখাচ্ছে দিগ্লিগিরি। রাস্তার পাশের সরু নদীটা এঁকেবেঁকে মেঘালয়ের ভেতরে হারিয়ে গেছে। সামনেই বিখ্যাত বর্ডার রোড সোজা চলে গেছে সিলেটের দিকে, আমাদের রাস্তা তার আগেই ডানে মোড় নিয়েছে। বাকি সময়টুকু রাস্তার ঝঞ্ঝাট আর অত গায়ে লাগলনা, বেশ পাহাড় দেখতে দেখতে নদীর পাড় ধরে সাইকেল চালিয়ে যখন বকশিগঞ্জ পৌঁছেছি তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাস্তাও সামনে ভালো। ফ্রন্ট লাইট আর টেইল লাইট মাউন্ট করে এক টানে শেরপুর।

কিন্তু আমাদের আজকের গন্তব্য ছিল শেরপুর থেকে আরো ১৫কিলো সামনের নকলায়, বুঝলাম আজ আর সেখানে যাওয়া ঠিক হবেনা, ইতিমধ্যেই ৯টা বেজে গেছে। তাড়াহুড়া করে আমাদের জন্য শেরপুর সার্কিট হাউজ ম্যানেজ করা হল। এত অল্প সময়ের নোটিসে সবকিছু এত সুন্দর করে ম্যানেজ করে ফেলার সব ক্রেডিট সাংবাদিক দ্বীপ ভাই এবং তার বন্ধুদের। খাবার টেবিলে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিয়ে ভোজনরসিক তিন বন্ধু আমাদের নিয়ে চললেন শেরপুরের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান অনুরাধায়, আমাদেরকে তারা গরম গরম ছানার পায়েস খাইয়েই ছাড়বেন। সারাদিনে খরচ হওয়া সকল ক্যালরি এক ঘন্টাতেই রিফিল করে যখন সার্কিট হাউজে ঢুকলাম তখন প্রায় ১০.৩০ টা। পরদিনের প্ল্যানটা দ্রুত সেরে নিয়ে এক ঘুমে রাতটা পার করে দিলাম। 

শেরপুর থেকে কিশোরগঞ্জঃ ১৪৯ কিলো

সকালবেলা তৈরী হয়েই দ্বীপ ভাইদের পরামর্শ মত নাস্তা করতে গেলাম আবার সেই অনুরাধায়। ওয়েটার দাঁত কেলিয়ে বলল আপনাদের বিল দেয়া হয়ে গেছে, যা খুশি ইচ্ছামত খান! মনে মনে ভাইয়াদের জন্য আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীর আর্জি জানিয়ে এই ব্ল্যাঙ্ক চেকের সদব্যবহার করতে বসে গেলাম।

আজ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী আমাদের গন্তব্য। পথ বেশ লম্বা, তাই ঠিক করলাম আজ আর কোন ডিট্যুর/শর্টকাট নয়, গত কয়েকদিনে অনেক শিক্ষা হয়েছে। বেশ নির্ঝঞ্ঝাটেই মাইলফলক গুলো একটার পর একটা দ্রুত পার হয়ে যেতে লাগল। ময়মনসিংহ পার হয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে থামলাম একটা প্রাইমারি স্কুলে। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো ক্লাস থেকে বের হয়ে বেশ অবাক হয়ে আমাদের দেখতে লাগল। তাদেরকে ভেতরে নেয়ার জন্য পিছে পিছে তাদের ম্যাডাম বের হয়ে আমাদেরকে দেখে একটু থমকে গেলেন। তারপর আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন সব বৃত্তান্ত। সব শুনে তার মুখ আনন্দে ঝলমল করতে লাগল। হাত ধরে টেনে ক্লাসের ভেতরে নিয়ে গেলেন, আমাদেরকে বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতেই হবে, আমরা নাকি তাদের জন্য অনেক বড় ইন্সপিরেশান! অসহায় চোখে শাজের দিকে তাকিয়ে দেখি সে নিশ্চিন্তে এই ভার আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। অপ্রস্তুত আমি বোকা বোকা হাসি দিয়ে শেষমেশ বেশ একটা বক্তৃতাই দিয়ে ফেললাম!

প্রাইমারি স্কুলে আমরা

ইতিমধ্যে আরো কয়েকজন টিচার এসে জড়ো হয়েছেন, আমাদেরকে অফিসে বসিয়ে নাস্তার আয়োজন করা হল। সেই ম্যাডাম খুব দুঃখ করে বলতে লাগলেন কিভাবে সারাজীবন স্রোতের বিপরীতে কিছু করতে চেয়েও কখনও করা হয়ে ওঠেনি। শাজ খুব সুন্দর করে বলল, ‘কিন্তু আপনি তো একজন ইনফ্লুয়েন্সার। আপনি সহজেই একসাথে অনেক মানুষকে স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারেন!’ অবশেষে যখন স্কুল থেকে বের হয়েছি তখন বিকেল প্রায় হয়ে এসেছে, এখনো প্রায় ৬০ কিলো পথ বাকি। বেশ দ্রুত প্যাডেল মেরে যখন কিশোরগঞ্জের গন্তব্যে পৌঁছলাম, সেখানে তখন অনেক বিষ্ময় অপেক্ষা করছে।

আমাদের থাকার কথা শাজের ক্যাম্পাসের সিনিয়র এক ভাইয়ার বাসায়, বিশাল তিনতলা বাসায় ভাইয়ার মা একাই থাকেন, তিনি এখানকার একটি স্কুলের প্রিন্সিপাল। বাসার সামনে পৌঁছে জানতে পারলাম বাসায় কেউ নেই, কিন্তু দোকানে চাবি রাখা আছে। নিতান্তই অপরিচিত একজনের বাসায় এভাবে ঢুকে চোর চোর অনুভূতি নিয়ে আমরা আন্টির জন্য অপেক্ষা করছি। খিদায় তখন জান যায় যায় অবস্থা। এর মাঝে তন্ময় ভাইয়া ফোন করে জানিয়ে দিলেন, ‘তোমরা বাসায় ঢুকে যা পাও সব খেয়ে ফেলো, আর ফ্রেশ হয়ে যা ইচ্ছা করো’। একটু পরে আন্টি ফোন দিলেন, জানা গেল তিনি আজ সকালে ঢাকা চলে গেছেন! আমরা তো হতভম্ব। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। কিছুক্ষণ পরেই এক গাদা খাবার নিয়ে হাজির হল আন্টির স্কুলের পিয়ন, বুঝলাম আন্টি ফোন করে বলে দিয়েছেন। আমরা খাবার পেয়েই হামলে পড়ে খাচ্ছি, এর মধ্যেই আবার ভাইয়ার ফোন-

-এখুনি নিচে যাও, আমার ফ্রেন্ড তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে গেছে।

-কিন্তু ভাইয়া আন্টি তো অলরেডি খাবার পাঠিয়েছেন!

-ও, তাহলে আরকি, রেখে দাও খাবার,সকালে খেয়ো!

এবারের প্যাকেট খুলে দেখি ভাইয়ার ফ্রেন্ড বাজারের যত তরকারী ছিল সব একটা করে কিনে নিয়ে এসেছেন। বুঝলাম, বেশ পাগলের পাল্লায় পড়েছি! হাসতে হাসতে সেই প্রথম দুইজন এলার্ম ছাড়া ঘুমাতে গেলাম। কারণ পরদিন গন্তব্য বেশ কাছেই।

 কিশোরগঞ্জ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ  ৫৫কিলো

পরদিন উঠে ভাবতে লাগলাম এত দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছে কাজ নেই, বরং নিকলি হাওড় ঘুরে আসা যায়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম হাওড়ে একদমই পানি নেই, অগত্যা সেই প্ল্যান বাদ দিলাম, একবারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌছেই শহরটা বেশ ঘুরে দেখা যাবে। ধীরে সুস্থে ৯.৩০ টা নাগাদ রওনা দিলাম। যাবার সময় চাবি রাখার মত কোন দোকান খোলা না পাওয়া যাওয়ায় তন্ময় ভাইয়ার কথামত সেটা দোতলার বারান্দায় ছুড়ে মারা হল!

রাস্তার দু ধারে প্রচুর ছোট ছোট পুকুর, বুঝলাম এইদিকে মাছ চাষ হয় বেশি। যাত্রার শুরুর দিন থেকেই শাজের প্যানিয়ারটা (সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঝুলানোর জন্য স্পেশালাইজড ব্যাগ) বেশ একটা ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, পুরুষ্টু এই বস্তুটাকে কোনোভাবেই ক্যারিয়ারের উপর স্থির রাখা যাচ্ছেনা। উপরন্তু প্যানিয়ার পেয়ে শাজও মোটামুটি তার ইহজগতের সকল প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় জিনিসপাতি ওর মধ্যে পুরে নিয়েছে। এদিকে আমি আমার ‘বাংলা ক্যারিয়ার’ আর পাতলা ব্যাগখানি নিয়ে বেশ সুখেই আছি। আমার টিশার্ট আর প্যান্ট সর্বসাকুল্যে দুই জোড়া, এক জোড়া গায়ে দিয়ে রাতে ঘুমাই, আরেক জোড়া গায়ে দিয়ে সারাদিন সাইকেল চালাই। রাতে এসে কেঁচে শুকোতে দিয়ে দেই, সকালের মাঝে শুকিয়ে গেলে ভালো, নয়তো ওই ভেজা জোড়াই সই।

পথে ভৈরব ব্রিজ পার হতে গিয়ে দেখি ব্রিজে সাইকেল নিয়ে ওঠার অনুমতি নেই, যদিও সেটা আগে থেকেই জানি, কারণ আজ হতে ঠিক দুই বছর আগের এই দিনে এই রাস্তা ধরেই সাইকেলে করে ঢাকা থেকে শ্রীমংগল গিয়েছিলাম। তাই এটাও জানি যে একটু অনুনয় বিনয় করলেই কাজ হয়। হল ও তাই।

ঘন্টা দেড়েক পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছে বেশ হতাশ হলাম। ঘিঞ্জি একটা শহর, জায়গায় জায়গায় বিশ্রি ট্রাফিক জ্যাম। একটু আরাম করে দম নেয়ার জন্য তিতাস নদীর পারে গিয়ে দেখি কেবল কচুরীপানা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা, নদীটাকে দেখে খুব মন খারাপ হল। শেষমেশ ঘুরাঘুরি বাদ দিয়ে শাজের ফ্রেন্ডের বাসায় জাঁকিয়ে বসে দুইজন জীবনদর্শন নিয়ে বেশ আলোচনায় ডুবে গেলাম, গভীর মনোযোগে আমাদের আলোচনা শুনতে যোগ দিল শাজের ফ্রেন্ডের ক্লাস ফাইভ পড়ুয়া ছোট বোন। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাদের জিপিএস ট্র্যাকার সহ অন্যান্য ছোট খাট ইকুইপমেন্ট গুলো কিভাবে কাজ করে তা জেনে নিল। আমরাও সুযোগ বুঝে গলা নামিয়ে তাকে ইচ্ছেমত দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর কুপরামর্শ দিয়ে নিতে ভুললাম না।

এদিকে নদী পার হয়ে উত্তরবঙ্গকে বিদায় জানানোর সাথেই সাথেই কিন্তু আমূল পরিবর্তন দেখা দিয়েছে কৌতূহলী জনতার মাঝেও। এখন আর কোন সরাসরি প্রশ্ন নয়, সবই ইন্ডিরেক্ট কমেন্ট। তার মাঝে অধিকাংশ জায়গা দখল করে আছে একটা প্রশ্ন- ‘এডি কি ছ্যাড়া না ছেড়ি!’ আমি খুব একটা অবাক হইনি, এ তো জানা কথাই! বাকি পথ জুড়েও এরপরে রাস্তায় আর কোন মেয়ে সাইক্লিস্ট চোখে পড়েনি। ব্যাপারটা একদমই অবাক করার মত নয়, আর অবাক করার মত নয় বলেই অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।  

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ফেনীঃ ১৪৫ কিলো

পুরো একদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি নীরস দিন কাটানোর পর ঠিক করলাম আজ বেশ সুন্দর একটা রুট প্ল্যান করতে হবে। হাইওয়ে ধরে চালানোর প্রশ্নই আসেনা, ম্যাপ খুলে একদম মনের মত রুট ও বের করে নিলাম, বর্ডারের পাশ দিয়ে এগিয়ে গুমতী নদীর পাড় ঘেষে রাস্তাটা বেশ লোভনীয়। গন্তব্য ও ফেনী, খুব বেশি দূরে নয়, ১২৫ কিলোর মত। 

সেই মোতাবেক চালানো শুরু। দেবিদ্বারকে বাইপাস করে ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে গুমতী নদী পার হয়ে একবারে কুমিল্লায় তথা ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ে তে গিয়ে উঠব এই হচ্ছে প্ল্যান। কিন্তু ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে গুমতী নদীর বাঁধের রাস্তায় উঠে আমার আনন্দ আর ধরেনা। হালকা সবুজাভ পানির আঁধার গভীর, সরু গুমতী ঠিক যেন একটি পাহাড়ি নদী! নদীর সমান্তরালে গোল হয়ে বেঁকে যাওয়া রাস্তাটা যেন চুম্বকের মত টানতে লাগল। সেই সাথে নিচে নদীর পাড়ে নামার উপায় ও খুঁজতে লাগলাম। এতকিছুর মাঝে আমার খেয়াল ই নেই যে আমাদের নদীর বাঁধ রোড ধরে যাওয়ার কথা নয়, নদী পার হয়েই সোজা চলে যাওয়ার কথা। দিক-বিদিক ভুলে চালিয়েই যাচ্ছি, মাঝে পছন্দমত একটা জায়গায় নেমে বেশ খানিকক্ষন জিরিয়েও নিয়েছি। হঠাৎ ম্যাপ খুলে দেখি আমরা আবার সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে চালিয়ে যাচ্ছি, ফেনীর দিকে নয়! আমি তো এই গোল গোল ঘুরতে থাকা রাস্তার চক্করের মাঝে পড়ে তখন পুরোই মাথা চুলকাচ্ছি। মানুষজন কে জিজ্ঞেস করতে একজন বলল ব্রিজ পার হয়ে ওইপারে গেলেই হাইওয়ে, ব্রিজ পার হয়ে যাওয়ার পর আরেকজন বলল যে না, ব্রিজের যে পাশ থেকে এলাম ওই পাশেই ফিরে যেতে হবে!

গুমতী ব্রিজ (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)

অতঃপর মানুষজনের থেকে সাহায্যের আশা বাদ দিয়ে ভালোভাবে ম্যাপ ঘেটে উল্টাদিকে চালানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই সন্ধান পাওয়া গেল ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ের। কিন্তু ততক্ষণে আমরা প্রায় ২০ কিলোর মত রাস্তা পিছিয়ে, এদিকে বেলাও পড়ে আসছে। আর আমাদের পায় কে, কুমিল্লার মাতৃভান্ডারে থেমে দই খেয়ে দে টান! আহা, রাস্তা তো নয়, যেন মাখন! কয়েকদিন ধরে কাদা-পাথরে সাইকেল চালানোর পর আজ হাইওয়ে পেয়ে আমাদের সাইকেল প্রায় উড়তে লাগল। ঘন্টায় ২৫-২৬ কিলো বেগে টানা চালিয়ে ৭.৩০ টা নাগাদ ফেনী পৌঁছলাম। গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ধরে এগুতে এগুতে আমাদের গন্তব্যস্থল খুঁজে বের করার ফাঁকে শহরটাকে দেখে নিচ্ছি,ফাঁকা ফাঁকা শহরটা বেশ ভালোই লাগল। আজকেও আমরা থাকব শাজের ক্যাম্পাসের সিনিয়র এক ভাইয়ার বাসায়। ভাইয়া তো এতদিন পরে ক্যাম্পাসের জুনিয়র পেয়ে খুব খুশি। পরিচয় পর্ব সেরে বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা দিয়ে ভরপেট খেয়ে সটান বিছানায়।

ফেনী থেকে চট্টগ্রামঃ ১১৯ কিলো

পরদিন আমাদের রাস্তা N1 তথা ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে সোজা চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে শাজ বা আমার কারোর ই ফ্রেন্ডের অভাব নেই, তাই ভাবলাম এক টানে বিকালের মাঝে পৌঁছে গিয়ে ফ্রেন্ডদের নিয়ে বেশ ঘোরা যাবে। কিন্তু হায়, তা আর হওয়ার ছিলনা!

সেদিন আমরা ধীরে সুস্থে বের হতে হতে ৭.৩০ টা বাজিয়ে দিলাম। মাখন ঢালা N1 দিয়ে চালাতে চালাতে যাচ্ছি, কিছুক্ষণ পরেই আমি উসখুস করতে শুরু করলাম, এই বৈচিত্র্যহীন N1 টা ঠিক ধাতে সইছেনা। তার উপর সামনেই মীরসরাই, সীতাকুন্ডের মত লোভনীয় সব জায়গা। পাহাড়ের এত পাশ দিয়ে যাব, অথচ পাহাড়কে একবার দেখা দিয়ে আসবনা, তাই কি হয়! সুযোগ বুঝে N1 ছেড়ে শাজকেও ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে তুললাম মীরসরাই-ফটিকছড়ি কানেক্টিং রোডে। ভাবলাম বেশ পাহাড় দেখতে দেখতে ফটিকছড়ি হয়ে বের হব, অতঃপর হাটহাজারী রোড হয়ে সোজা চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়।

ডান পাশে খৈয়াছড়া ঝর্ণা আর বাম পাশে বোয়ালিয়া বাউশ্যা ঝর্ণার ট্রেইল, মাঝখান দিয়ে আমাদের রাস্তা। কিন্তু রাস্তাটা যে একদম সোজা পাহাড়ে উঠে গেছে! আমরাও পিছনের গিয়ার একদম এক এ নিয়ে এসে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে প্যাডেল মারতে লাগলাম। অনেকক্ষণ চালানোর পরেও দেখি মাত্র কয়েকশ মিটার এগিয়েছি, তার উপর আজকে চড়া রোদ! শাজ একদম ধৈর্য্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেল, কেন আমরা N1 এর মত রাস্তা ছেড়ে এই রাস্তা ধরে যাচ্ছি সেটাই তার মাথায় ঢুকছেনা, ও আবার N1 এ ফিরে যেতে চায়। স্পষ্ট বুঝতে পারছি শাজের কথাই যুক্তিযুক্ত, ম্যাপ অনুযায়ী যদি আসলেই ২০কিলো এইরকম রাস্তায় চালাতে হয় তাহলে আজ রাত বারোটার আগে চিটাগং যাওয়া সম্ভব হবেনা। তার উপর আমাদের কাছে পানিও পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। কিন্তু ততক্ষণে আমরা একদম মীরসরাই রেঞ্জের ভিতরে ঢুকে গেছি, দুই পাশে এই পাহাড়ের সারি ফেলে কিভাবে এখন N1 এ ফিরে যাই! অতঃপর কিছুক্ষণ নিজেকে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে শাজকে বললাম, ‘ঠিক আছে, তুমি চাইলে নিশ্চয়ই ফিরে যাব, কিন্তু আমি এই রাস্তা ধরেই এগুতে চাই’। ততক্ষণে পাহাড় ও নিশ্চয়ই তার স্বভাবমত তাবিজ-কবচ করা শুরু করে দিয়েছে, কারণ দেখলাম শাজও আর উলটো দিকে না ঘুরে খাড়া রাস্তা ধরে রওনা দিল।

আহা! অবশেষে পাহাড়! কি ভীষণ নিঃসঙ্গ! কি ভীষণ দাম্ভিক! তার কাছে সকলের প্রবেশাধিকার নেই। কেননা সবকিছুর বিনিময়ে এই অধিকার অর্জন করতে হয়, যেটা খুব সহজ নয়। যুগে যুগে প্রচুর পর্বতারোহী পাহাড় আর মানুষের মাঝের এই আকর্ষণকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, কিন্তু ব্যাখ্যার অতীত বলেই হয়তো সেটা একেকজনের ভাষায় সম্পুর্ণ ভিন্ন রুপ নিয়েছে।

Once on the mountain I knew (or trusted) that this would give way to total absorption with task at hand. With times I wondered if I had not come a long way only to find that what I really sought was something I had left behind.

– Thomas F. Hornbein

অবশেষে দুই ঘন্টা পর পায়ের সমস্ত পেশির ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার উপেক্ষা করে আমরা রাস্তাটার সর্বোচ্চ বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছলাম। একটা ছোট্ট বাঁশের তৈরি জুমঘরের মত জায়গা, সেখানে একজন বৃদ্ধ পাহাড়ি তার নাতনিকে নিয়ে কাঠ কাটছেন। তাদের কাছে একটু পানি চেয়ে নিলাম। উনার কাছে জানলাম, এরপর আর ‘উঠন্তি’ নাই, খালি ‘নামুন্তি’। শুনে আমাদের আনন্দ আর ধরেনা!

মীরসরাই রেঞ্জে (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)

পিছনের ব্রেকটা ভালোভাবে মাউন্ট করে শুরু করলাম নামা! পাহাড়ে এই ‘নামুন্তি’ গুলো সব ‘উঠন্তি’র কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। যদিও আপহিল কষ্টকর, কিন্তু ডাউনহিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। স্পিড খুব ভালোভাবে কন্ট্রোলে না রাখলে বাজে ধরনের fatal এক্সিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নামতে নামতে নারায়ণহাটের আগের একটা বাজারে এসে থামলাম। এখানে খেয়ে নেয়া যায়, সকাল থেকেই তেমন কিছুই পেটে পড়েনি, হঠাৎ প্ল্যান চেঞ্জ করায় নাস্তাও করা হয়নি ওভাবে। অবশেষে খেয়ে দেয়ে শাজের মুড একলাফে জায়গামত এসে বসল। দুইজন এরপরের আপহিল-ডাউনহিলগুলো বেশ দ্রুতই পার হয়ে গেলাম। প্রায় তিনটা নাগাদ আমরা এসে সমতলে পৌঁছলাম। এবার শুধু সোজা গেলেই অক্সিজেন মোড়, আশা করা যাচ্ছে সন্ধ্যা থাকতেই পৌছানো যাবে।

কিন্তু সেই আশাতেও গুড়েবালি! এ তো রাস্তা নয়, রাস্তা নামের কলংক! সড়ক ও জনপথ বিভাগের কালভার্ট মেরামতের কাজ চলছে, সুতরাং রাস্তার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ৬০ কিলোর মাঝে প্রায় ৩০ কিলো রাস্তা জুড়ে একই অবস্থা, সাইকেল আমাদের বাহন নাকি আমরা সাইকেলের বাহন সেটা বোঝাই দায়! তার উপর বিশ্রি ট্রাফিক। মাঝপথে আবার MTB Bangladesh এর কয়েকজন সাইক্লিস্টের সাথে দেখা হয়ে গেল, শাজ ও অনেকদিন পর তার পরিচিত স্বজাতির সন্ধান পেয়ে বেশ খুশি। শেষ পর্যন্ত ধুঁকতে ধুঁকতে যখন চিটাগং শহরে এসে পৌঁছেছি তখন আমরা দুইজন ই ধৈর্য্যের একদম শেষ সীমানায়।

কোনমতে চাঁদ্গাও আবাসিক এলাকায় আমার ফ্রেন্ড রাইসার বাসা খুঁজে বের করলাম, গোসল সেরেই হামলে পড়লাম ওর রান্নাঘরে। দুই প্লেট তেহারী চোখের নিমিষে খালি করে দিয়ে তবে শান্তি! প্রতিদিন প্রচুর ইলেক্ট্রোলাইট ট্যাবলেট আর পুষ্টিকর খাবার খেয়ে আমার ওজন একটু বেড়ে গেছে বলেও মনে হচ্ছে। এর মাঝে রাতেই রাইসা সহ আরেক মাথা নষ্ট প্ল্যান করে ফেললাম। ঠিক হল, রাইসাও পরেরদিন অফিস কামাই দিয়ে আমাদের সাথে ফাসিয়াখালি পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে যাবে।

কিন্তু ওর তো সাইকেল ই নেই!

আরে এ কোন সমস্যাই না, ঠিক হল পরদিন সকালে উঠেই একটা আনকোড়া নতুন সাইকেল কিনে ফেলা হবে। এ পর্যন্ত ঠিক করে ওই রাতের মত তিনজন ক্ষান্ত হলাম।

চট্টগ্রাম থেকে ফাসিয়াখালিঃ ৯৪ কিলো

পরদিন সকালে উঠে আমাদের প্রথম কাজ চিটাগং এর সব সাইকেলের দোকানে ফোন দেয়া। কিন্তু ৭টার সময় কেউ ই দোকান খুলতে রাজি নয়, অনেক অনুরোধ করেও তেমন সুবিধা করা গেলনা। অগত্যা রাইসাকে রেখে আমরা দুইজন ই বেড়িয়ে পড়লাম ফাসিয়াখালির উদেশ্যে, দূরত্ব ৯৪ কিলো।

আমরা আজকে N1 কে এভয়েড করে আনোয়ারা-বাঁশখালি রাস্তা ধরে এগুবো, সাথে আমার মনে গোপন বাসনা, হয়তো কুতুবদিয়া দ্বীপে একটা ডিট্যুর নিয়ে আসা যাবে! কিন্তু শাজ এটা টের পেয়েই ফরমান জারি করল, আজ কোনোভাবেই কোন ডিট্যুর নেয়া যাবেনা, অনেক হয়েছে। আজ সোজা ফাসিয়াখালি গিয়ে তবে থামা!

আমি হয়তো এত সহজে হাল ছেড়ে দিতাম না, কিন্তু দুইজনের ই মাথার পিছনে একটা নতুন আশংকা জট পাকিয়ে উঠছে। আমরা ট্রিপের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে তার থাবা বসাতে শুরু করেছে। সেটা আমরা শুরুর দিকে তেমন টের না পেলেও এখন অবস্থা আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছি দূর পাল্লার বাস গুলো যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ইতিমধ্যে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চিন্তায় পড়ে গেলাম, আমাদেরকে টেকনাফ পর্যন্ত যেতে দেবে তো? নাকি মাঝপথে ফিরিয়ে দেয়া হবে? তার উপর বাসা থেকে একটার পর একটা ফোন অস্থিরতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলল। শেষ পর্যন্ত মাথায় একটাই চিন্তা এসে ঠেকল, যে করে হোক দ্রুত ট্রিপ শেষ করে ফিরতি পথ ধরা দরকার। অতএব দুইজন ই বেশ গম্ভীর মুখে মাইলস্টোনগুলো পার করতে লাগলাম। তার উপর শুরুর দিকে ১০-১৫ কিলোর মত রাস্তার অবস্থাও খুব বাজে। খুবই অল্প পথ, তবু যেন আজ পথ একদম ফুরোতেই চাচ্ছেনা।

বিকালের মাঝেই পৌঁছে গেলাম ফাসিয়াখালি আর্মি ক্যাম্প, এখানে শাজের বড় বোন আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। যেতেই দুইজন আর্মির লোক এসে শরবত, ডাবের পানি আর নাস্তা দিয়ে গেল সামনে। খেয়েদেয়ে এখন প্ল্যান করার পালা।

শুরুতেই টিকিট কাটতে হবে। কালকে টেকনাফ গিয়ে আমাদের গন্তব্য শেষ। কিন্তু যা আশংকা করছিলাম তাই, টেকনাফ থেকে কোন দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যাচ্ছেনা। অবশেষে শ্যামলীর এসি বাস পেলাম, অনেক কষ্টে তাদেরকে লাগেজ বক্সে দুটো সাইকেল নিতে রাজি করানো গেল।

যেহেতু কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট প্রবেশ নিষিদ্ধ, তাই কক্সবাজারকে কিভাবে বাইপাস করা যায় সেটা দেখতে হবে।  ম্যাপে দেখলাম রামু বাইপাস ধরে হিমছড়ির পাশ দিয়ে একটা রাস্তা সোজা মেরিন ড্রাইভে নেমে গেছে। ঠিক করলাম এ রাস্তা ধরেই যাব। বাস বিকাল ৫টায়, পথ খুব কম নয়, ওদিকে রামু বাইপাসের কি অবস্থা তাও জানিনা, তাই ঠিক হল পরদিন অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হবে। দুইজন ই দ্রুত খেয়ে দেয়ে ৯.৩০ এর মাঝে শুয়ে পড়লাম। 

ফাসিয়াখালি থেকে টেকনাফঃ ১২১  কিলো

আজ আমাদের শেষ দিন। ফাঁকা ফাঁকা একটা অনুভূতি নিয়ে শেষ বারের মত তৈরী হয়ে ভোর ৫টায় বের হয়ে গেলাম আর্মি ক্যাম্প থেকে। তখনো চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে, মেঘলা বলে তারা খুব একটা নেই। ধীরে ধীরে আলো ফুটতে শুরু করল, আর সাথে চারপাশের ঘন জংগল ও দৃশ্যমান হতে শুরু করল। এতক্ষণ অন্ধকারে চালাচ্ছিলাম বলে বুঝতে পারিনি, আমরা আসলে একটার পর একটা অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। শুরুতে ফাসিয়াখালি ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি পড়ল, তার পরে মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্ক। জংগল গুলো একটু গভীরে ঢুকেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, এ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী। অনেক কষ্টে সাইকেল নিয়ে বনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা দমন করলাম।

সকাল ৭টা নাগাদ আমরা এসে পড়লাম একটা রাবার বনের ভেতর, একটু বিশ্রাম নেয়ার ছুতোয় দুইজন ই ঢুকে গেলাম বনের ভেতর। সারি সারি রাবার গাছগুলোর প্রায় প্রতিটাতেই একটা করে টিনের বাটি বেঁধে রাখা, রাবার গাছের সাদা রঙের রস চুইয়ে এসে বাটিতে জমা হচ্ছে, রসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কৌশলের সাথে গাছের গায়ে সরু পথ বানিয়ে দেয়া হয়েছে।

একটু পরেই আমরা রামু বাইপাসে এসে উঠলাম। রাস্তার অবস্থা নিয়ে সব আশংকা মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে দেখা গেল, রামু-মরিচা রাস্তাটা অসম্ভব সুন্দর! দুইপাশেই ঘন বন, একটু পর পর হাতি পারাপারের জন্য সাবধান বাণী। দুইপাশেই ছোট বড় অসংখ্য টিলা দেখে মনে হচ্ছে জায়গাটা মাউন্টেন বাইকিং এর জন্য আদর্শ হতে পারে। একটা জায়গায় বনের ভিতর উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখি বেশ ভিতরে অনেক বড় একটা জলাশয় দেখা যাচ্ছে, ধারণা করে নিলাম, নিশ্চয়ই ওখানে হাতিরা পানি খেতে আসে!

একটু পরেই আমরা এসে পৌঁছলাম কক্সবাজার টেকনাফ রোডের সংযোগ স্থলে। ডানে মোড় নিয়ে গিয়ে ধোয়াপালং আর হিমছড়ির পাশ দিয়ে সোজা মেরিন ড্রাইভে নেমে যাব। চালাতে চালাতে চোখে পড়তে লাগল ‘বিচ স্পেশাল’ নারিকেল গাছগুলো। সমুদ্র কাছেই তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরেই নিজেদেরকে আবিষ্কার করলাম দুই পাহাড়ের মাঝখানের একটা সরু রাস্তায়, দুই পাশের পাহাড় এখানে একটা গুহার মত জায়গা তৈরি করেছে। সাইকেল থামিয়ে পটাপট ছবি তুলে নিলাম, হিমছড়ির পাশ দিয়ে যে এত সুন্দর একটা রাস্তা আছে সেটা কখনই জানতাম না। বেশকিছু আপহিল-ডাউনহিল পার হয়ে এসে থামলাম ঋজু খাল ব্রিজে। খালটা একটু দূরেই গিয়ে ডান পাশে সমুদ্রে মিশে গেছে, বাম পাশে সারি সারি সাম্পান নৌকা নোঙ্গর করে রাখা। কি অদ্ভূত সুন্দর একটি দৃশ্য!

ওই যে গুহা (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শাজ)

এরপর সাইকেল নিয়ে সোজা নেমে গেলাম সাগরে। এক দুইজন টুরিস্ট ছাড়া পুরো এলাকা খা খা করছে। এবার মেরিন ড্রাইভ দিয়ে বাকি রাস্তা সোজা টেকনাফে গিয়ে শেষ। প্রচন্ড রোদ, কোথাও এক ফোঁটা ছায়া নেই, মেরিন ড্রাইভের পাশে একটু পর পর রোহিংগাদের প্রচুর অস্থায়ী ছাপড়া ঘর দেখা যাচ্ছে।

টেকনাফের একদম শেষ প্রান্ত শাহ পরীর দ্বীপে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বুঝতে পারছি সেটা আর সম্ভব হবেনা। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, কিছুক্ষণ পরেই আমাদের বাস ছাড়বে। অল্প সময়ে দেশটার একটা বড় অংশ দেখলাম, নানা রকম অভিজ্ঞতায় ভরা গল্পের ঝুলিটাও বেশ ভারীই। তবুও পার হয়ে যাওয়া এক একটি মাইলফলকের সাথে কেমন একটা শূণ্যতা ভর করতে শুরু করল। দশ দিন আগে যখন তেঁতুলিয়ায় নামলাম সেদিনটাকে অন্য এক সময়রেখার কোনো দিন বলে মনে হচ্ছে, আমরা যেন ধরে নিয়েছিলাম অনির্দিষ্টকালের জন্য পথে নেমেছি। কিন্তু পথ আসলে সবসময় ই শেষ হয়ে যায়, সময়ের একমুখী প্রবাহ থামানো যায়না। আজকেও পথ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আর দৃষ্টিসীমার এক পাশে পাহাড়ের সারি, অন্যপাশে সমুদ্র রেখে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের শেষ মাইলফলকের দিকে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *